১৪১ তম মহান মে দিবসে বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস এন্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের লিফলেট
দুনিয়ার মজদুর এক হও
গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করে ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ, জিনিসপত্রের দাম কমানো এবং গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নসহ ফেডারেশন ঘোষিত ১০ দফার ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তুলুন।
লোকাল গার্মেন্টস, দর্জি ও হোসিয়ারী শিল্পের শ্রমিকদের জন্য অভিন্ন মজুরি বোর্ড গঠন ও শ্রমিকদের নিয়োগপত্র-পরিচয়পত্র প্রদানসহ শ্রমআইন বাস্তবায়ন করতে হবে।
মার্কিন-ইসরাইল কর্তৃক ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-আগ্রাসন ও গণহত্যাসহ বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণি, নিপীড়িত জাতি-জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলুন।
সকল কারখানা ও শিল্পাঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠা ও শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তির লক্ষ্যে সংগঠিত হোন এবং ঐক্যবদ্ধ দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলুন।
শ্রমিক শ্রেণীর বৈপ্লবিক চেতনা উর্দ্ধে তুলে ধরুন এবং যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস পালন করুন

প্রিয় গার্মেন্টস শ্রমিক ভাই ও বোনেরা,
সংগ্রামী শুভেচ্ছা নিবেন। বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে ১ মে শ্রমিক শ্রেণীর জন্য এক ঐতিহাসিক ও গৌরবজনক অধ্যায়। ১ মে হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস। উনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে আট ঘন্টা শ্রম দিবসের দাবীতে যে সংগ্রামের শুরু তা অগ্রসর হয়ে বিস্ফোরিত হয় ১৮৮৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনের জোয়ারের প্রেক্ষাপটে ১৮৬৬ সালে বাল্টিমোরে ৬০টি ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা গঠন করেন আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণীর প্রথম জাতীয় ফেডারেশন ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন। তৎকালীন সময় শ্রমিকদের কাজের কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট ছিলো না। ফলে শ্রমিকের নাকের ডগায় দম থাকা পর্যন্ত মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাতো। এতে প্রায় ৩০-৩৫ বছর বয়সেই শ্রমিকরা মৃত্যুবরণ করতেন বলে জানা যায়। তাই শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রণী নেতারা ২৪ ঘণ্টাকে তিনভাগে ভাগ করে ৮ ঘন্টা কাজ, ৮ ঘন্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘন্টা বিনোদন ও নিজেদের সংগঠন গড়ে তোলার কাজে সময় নির্ধারণের দাবি তোলে। কিন্তু মালিক শ্রেণীর পাহারাদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ১৮৮৬ সালের ১লা মে শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত করে শিকাগো শহরের রাজপথ। পুলিশের পৈশাচিক গুলিবর্ষণে নিহত হন ৭ জন শ্রমিক এবং হতাহত হন অনেক। ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের এই ঐতিহ-াসিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবার জন্য পুলিশ গ্রেপ্তার করে ৭ জন শ্রমিক নেতা অগাষ্ট স্পাইজ, সীমফেন্ডেন, মাইকেল, জর্জ এঞ্জেল, এডলফ ফিশার, লুই নিংগ ও অঙ্কার নিবেকে। মালিক শ্রেণী ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারী সরকার ফাঁসির আদেশ দেয় শ্রমিকশ্রেণীর নির্ভীক, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বীর নেতা অগাষ্ট স্পাইজ, পারসন, ফিশার ও এঞ্জেলকে। শুধু ৮ ঘন্টা শ্রমদিবসের জন্য মে দিবসের এই আন্দোলন নয়, পরবর্তীতে সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শ্রেণী বৈষম্য ধ্বংস করার শ্রমিকশ্রেণীর শোষণ মুক্তির লক্ষ্যে এই আন্দোলনকে অগ্রসর করা হয়।
সংগ্রামী সাথী
আজ এমন এক সময় বিশ্ব শ্রমিক শ্রেণী মহান মে দিবস পালন করছে যখন মার্কিন-ইসরাইল কর্তৃক ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ-আগ্রাসন ও গণহত্যাসহ বিশ্বব্যাপী সামাজ্যবাদী শক্তিসমূহ অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের দেশে দেশে জনগণকে হত্যা করে বিশ্বযুদ্ধের উন্মাদনায় লিপ্ত রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শিবির। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব জননিরাপত্তা প্রচন্ড হুমকির মধ্যে পড়াসহ বিশ্ব অর্থনীতি আরো টালমাটাল হয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানী সংকট তীব্র হচ্ছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় ও শিল্প উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিসহ জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এতে জ্বালানী তেলের মালিকরা অবাধ মুনাফা অর্জন করলেও বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ চেইন ভেঙ্গে যাওয়ার শংকা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ছাঁটাই-চাকুরিচ্যুতি বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণী ও জনগণের মধ্যে অভাব-অনটন-দারিদ্র্যতা আশংকাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতির কথা বলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অতি বিশ্বস্ত দালাল ড. ইউনুসের আমলে জাতীয় ও জনস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দাসত্বমূলক শুল্ক ও বাণিজ্য চুক্তি করা হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়ন করতে তৎপর রয়েছে। গার্মেন্টস পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে আষ্টে-পৃষ্টে বেঁধে ফেলে। ফলে এলপিজি, সয়াবিন, গম ইত্যাদি পণ্যের মত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অতিরিক্ত দামে তুলা আমদানি করতে হচ্ছে। প্রতি কেজি তুলা ৬০ সেন্টস বা ২৫০ টাকা বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলক আমদানি করতে হচ্ছে। এছাড়া পলিস্টার ও নাইলনেরমত পেট্রোলিয়াম বাইপ্রোডাক্টসের দামও হু হু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানী সংকটের কারণে দেশের গার্মেন্টস উৎপাদন দৈনিক ২০-৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এসব কারণে শিপমেন্টও ডিলে (বিলম্ব ঘটা) ঘটার শংকায় শ্রমিকদের পণ্য উৎপাদন সময় (লীড টাইম) অনেক কমে যাচ্ছে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অর্ডার (ক্রয়াদেশ) কমে যাওয়ার অজুহাতে শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া রাখাসহ ছাঁটাই-চাকুরিচ্যুতি বৃদ্ধি করছে। অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে যাওয়ার সুযোগে মালিকরা বিদ্যমান মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা আরও কমিয়ে দিয়ে শ্রমিকদের জীবনমান আরও নিচে নামিয়ে এনে তাদের জীবন-যাপনকে কঠিন করে তুলছে। বাংলাদেশের পোশাক খাতে পশ্চিমা লগ্নিপুঁজি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীগুলো মোটা অংকের শুল্ক চাপিয়ে দিয়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের উপর শ্রম শোষণকে আরও তীব্র করছে। সরকার এবং কারখ-ানার মালিকরা অর্ডার চলে যাওয়ার আওয়াজ তুলে এর দায় শ্রমিকদের কাঁধে চাপিয়ে দি”েছ। দেশের শ্রমিকদের সস্তা শ্রম নিংড়ে মুনাফার পাহাড় গড়তে পুঁজিপতিগোষ্ঠীর আর কোন বিকল্প নেই। দেশের কারখানার মালিকরা বিদেশী একচেটিয়া পুঁজিপতি গোষ্ঠীর সাথে দরাদরি করে শ্রমিকদের উপর বাড়তি শোষণের মাধ্যমে তাদের মুনাফার হার ঠিকই রাখবে। অপারেটর প্রতি মেশিন বরাদ্দ বাড়িয়ে শ্রমঘনত্ব বাড়িয়ে দিয়ে তাদের মুনাফার হার ঠিক রাখবে। কিন’ বাজারে উ”চ মূল্যস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করছে না। ২০২৩ সালে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণ করা হলেও তা দিয়ে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী একটি শ্রমিক পরিবারের পক্ষে কোনভাবেই চলা সম্ভব হছে না। খেয়ে না খেয়ে অর্ধাহারে অনাহারে পোশাক শ্রমিকদের পরিবারগুলি দিনাতিপাত করছে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ৩০ হাজার টাকার নিচে মজুরি দিয়ে পোশাক শ্রমিকদের কাছ থেকে ভালো উৎপাদনশীলতা কোনভাবেই আশা করা যায় না। বর্তমানে শ্রম আইনে ৩ বছর অন্তর মজুরি নির্ধারণের বিধান কার্যকর থাকলেও এখন অব্দি মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের কোন তৎপরতা পরিলক্ষিত হ”েছ না। বরং অনেক কারখানায় শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া থাকলেও তা আদায় করে দিতে সরকার মালিকদের উপর চাপ সৃষ্টির পরিবর্তে শ্রমিকদের উপরেই গুলি, লাঠিচার্জ চালিয়ে যা”েছ। বর্তমান আইনে কালো তালিকাভুক্তি (ব্ল্যাক লিস্ট) নিষিদ্ধ হলেও ন্যায্য দাবিতে সো”চার শ্রমিকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মালিকরা এখনো তালিকাভুক্ত করে যা”েছ। কারখানার নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে শ্রমিকরা টু শব্দটি করলে ২৩-ধারায় অপপ্রয়োগে শোকজ এনে তাদের বহিস্কার করে দেয়া হয়। কিন’ ম্যানেজমেন্টের শ্রম অসদাচরণের প্রেক্ষিতে শ্রমিকরা মালিক বা সরকারী দপ্তরের কাছ থেকে কোন প্রতিকার পায় না। বাংলাদেশের শ্রম আইন এবং আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের স্বীকৃতি থাকলেও কোন কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলেই শ্রমিকদের বের করে দেয়া হয়। শিল্পাঞ্চলে সভা-সমাবেশ তো দূরের কথা কারখানায় শ্রমিকদের কথা বলা বা মতপ্রকাশের সুযোগটুকুও প্রদান করা হয় না। অথচ মালিকদের এই ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধী তৎপরতা (এন্টি ট্রেড ইউনিয়ন ডিসক্রিমিনেশন) সম্পর্কে সকল মহল অবগত থাকলেও শ্রমিকরা কোন প্রতিকার পা”েছ না। বরং মালিকদের প্রেসক্রিপশন মতে শ্রমদপ্তরের কর্মকর্তারা কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ট্রেড ইউনিয়নের আবেদন বাতিল করে দি”েছ। এসব সরকারের দপ্তরের কর্মকর্তাদের ঘুষ-দুর্নীতির কারণে শ্রমিকরা কোন আইনি প্রতিকার পায় না। বরং তাদের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মদদে মালিক শ্রেণী সন্ত্রাস, মস্তান ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে শ্রমিকদের হয়রানি ও নির্যাতন করার সুযোগ পায়। প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে গার্মেন্টস সেক্টরে মালিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভুঁইফোঁড় টাইপের দালাল শ্রমিক সংগঠন ও এনজিও সংসী ব্যাঙ এর ছাতার মত গড়ে উঠছে। তারা বিভিন্ন কমিশন বাণিজ্যে যুক্ত থেকে শ্রমিকদেরকে বিভ্রান্ত করে মালিকদের স্বার্থ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছে। বিদেশী অর্থায়নে বিভিন্ন এনজিও সংসী শ্রমিক অধিকারের কথা বলে শ্রমিকদের শ্রেণী সচেতন ও রাজনৈতিক সচেতন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তারা শ্রমিকদের মজুরি দাসত্বে আটকে রাখতে চায়। মে দিবসের ১৪০ বছর পর আজকেও শ্রমিক শ্রেণীর টুটি চেপে ধরার হীন চেষ্টা করছে মালিক শ্রেণী ও তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী রাষ্ট্র। গার্মেন্টস সেক্টরে এর বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের স্বরুপ উন্মোচন করে শ্রমিকদের আইনি অধিকার রক্ষা ও শোষণমুক্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস এন্ড টেষ্টাইল শ্রমিক ফেডারেশন আপোসহীন ও সংগ্রামী ধারার ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজির শোষণ থেকে মুক্ত করা তথা গার্মেন্টস শ্রমিকদের দাবি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সফল করতে হলে মে দিবসের চেতনায় আমাদের সংগঠন-সংগ্রামকে অগ্রসর করতে হবে। তাই আসুন, মে দিবসের কর্মসূচি সফল করার জন্য দলে দলে যোগদান করি। পথ যতই আঁকাবাঁকা হোক, শ্রমিক শ্রেণীর বিজয় নিশ্চিত।
সংগ্রামী অভিনন্দনসহ,
মোহাম্মদ ইয়াসিন
সভাপতি
তফাজ্জল হোসেন
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস এন্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন
(বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ, রেজিঃ নং-বাজাফে-৫ এর শাখা)
৮ বি. বি. এভিনিউ (৩য় তলা) গুলিস্তান, ঢাকা হতে প্রকাশিত ও প্রচারিত। যোগাযোগ: ০১৩০৩-৩৮৯২৯৬, তাং ২০/০৪/২০২৬
