চা শ্রমিক নেতা রাজদেও কৈরি’র শোকসভার লিফলেট
দুনিয়ার মজদুর এক হও
শোককে শক্তিতে পরিণত করুন
চা-শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই-সংগ্রামের নেতা, চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি চা-শ্রমিক নেতা রাজদেও কৈরী’র মৃত্যুতে শোকসভা
২৬ এপ্রিল ২০২৬ রবিবার, বিকাল ৩ টায়, শমসেরনগর বাজার, কমলগঞ্জ।
সংগ্রামী চা-শ্রমিক ভাই ও বোনেরা
আমরা গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে চা-শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সৎ, নীতিনিষ্ঠ, আপোসহীন, সংগ্রামী নেতা চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি প্রবীণ চা-শ্রমিকনেতা রাজদেও কৈরী গত ৯ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬.২৫ টার সময় কমলগঞ্জ উপজেলা আলীনগর চা-বাগানের ইটাখলা দক্ষিণ শ্রমিক লাইনের নিজ ঘরে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। তিনি ১৯৬৬ সালের ৩ আগষ্ট কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা-বাগানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম চন্দ্র দেও কৈরী এবং মাতা জানো কৈরী। ব্যক্তি জীবনে তিনি এক পুত্র সন্তানের জনক। মৃতুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৬০ বছর। প্রয়াত রাজদেও কৈরী ২০১৫/১৬ সালের দিকে নিজে থেকে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সভাপতি, প্রখ্যাত চা-শ্রমিকনেতা মফিজ আলীর কনিষ্ঠ পুত্র নুরুল মোহাইমীনের সাথে যোগাযোগ করে চা-শ্রমিক সংঘের কাজের সাথে সম্পৃক্ত হন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১২ আগষ্ট শমসেরনগরে এক শ্রমিক সভার মাধ্যমে রাজদেও কৈরীকে আহবায়ক এবং হরিনারায়ন হাজরা ও শ্যামল অলমিককে যুগ্ম-আহবায়ক করে চা-শ্রমিক সংঘের মৌলভীবাজার জেলা কমিটি পুণগঠন করা হয়। এ সময়ে চা-শ্রমিক সংঘের উদ্যোগে প্রচার আন্দোলন ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রেক্ষিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতি বছর কমপক্ষে একটি প্রচারপত্র দিয়ে শ্রমিকদের সচেতন ও সংগঠিত করার প্রচেষ্ঠা চলে। এ প্রক্রিয়ায় রাজদেও কৈরীর নেতৃত্বে আলীনগর, সুনছড়া, শমসেরনগর, দেওছড়া, চাতলাপুর, রাজনগর ইত্যাদি চা-বাগানের কয়েকশ শ্রমিকের অংশগ্রহণে ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির উদ্যোগে মৌলভীবাজার শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও চা-শ্রমিক সমাবেশের কর্মসূচিও পালন করে দৈনিক ৬৭০ টাকা মজুরিসহ ১১ দফা দাবিতে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নিম্নমত মজুরি বোর্ড বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এই সময়ে চা-শ্রমিক সংঘের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হতে থাকলে চা-শ্রমিকনেতা হরিনারায়ন হাজরা ও স্বপন নায়েকের উপর শারিরিকভাবে হামলা, বসত বাড়িতে ভাংচুর, গরু-ছালগ লুটপাট করে সর্বশান্ত করা হয়। উপরন্তু চা-শ্রমিক সংঘের সাথে সম্পর্কিত ৪ জন শ্রমিককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, মিথ্যা মামলার আসামী করা হয় এবং কাজল হাজরাকে গ্রেফতারকে জেলে পাঠানো হয়। বাগান কর্তৃপক্ষের তদন্তের নামে প্রহসনের বিচারে হরিনারায়ন হাজরাকে স্থায়ীভাবে চাকরী থেকে বরখাস্ত করা হয়। চা-শ্রমিক নেতৃত্বের উপর হামলা, আক্রমণ মোকাবেলায় এবং হরিনারায়ন হাজরা বেআইনী চাকুরিচ্যুতির প্রেক্ষিতে তাকে রক্ষায় রাজদেও কৈরী বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নেন। চা-শ্রমিক সংঘের কার্যক্রম অগ্রসর করার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, দ্রুততারা সাংস্কৃতিক সংসদ, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। গত কয়েক বছর যাবত তিনি শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভোগ ছিলেন। তাঁর অসুস্থ্যততা সত্ত্বে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ চা-শ্রমিক সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির ১ম সম্মেলনে তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। বিভিন্ন সময়ে নানাপক্ষ থেকে তাঁকে প্রলুদ্ধ করার চেষ্টা হলেও তিনি এসব উপেক্ষা করে চা-শ্রমিক সংঘের কার্যক্রম অগ্রসর করতে সচেষ্ট থাকেন।
বন্ধুগণ,
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতির এই সময়ে দৈনিক মাত্র ১৮৭.৪৩ টাকা মজুরিতে চা-শ্রমিকদের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতে হয়। তার উপর বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকদের মজুরি ও রেশন নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না। যার কারণে চা-শ্রমিকরা অত্যন্ত মানবেতরভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে একজন শ্রমিকের দৈনিক পরিশ্রমের পর পরবর্তী দিন কাজে যোগদানের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়োজনে দৈনিক তিন বেলা সাধারণভাবে খাবারের জন্য ২৫০/- (৫০+১০০+১০০) টাকা দিলেও পেট ভরে না। তাই বর্তমান বাজারদরে স্ত্রী পুত্র কন্যাসহ মা-বাবাকে নিয়ে ৬ সদস্যের একটি পরিবারের জন্য দৈনিক ন্যূনতম ১,০০০/- টাকা দরকার। বাংলাদেশে ক্রিয়াশীয় জাতীয় শ্রমিক সংগঠনসমূহ জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। তাই সামাগ্রিক বিচারে বর্তমান বাজারদর, মূল্যস্ফীতি, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো, মজুরি কমিশন ঘোষিত মজুরি, দেশের অপরাপর সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি এবং প্রতিবেশী নয়াঔপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ চা উৎপাদনকারী দেশের শ্রমিকদের প্রাপ্ত মজুরি পর্যালোচনা করে ৬ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণের খরচ হিসাব করে বাঁচার মত মজুরি ও বার্ষিক ১৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট প্রদান করাসহ চা-শ্রমিক সংঘের ১০ দফা দাবিতে প্রয়াত রাজদেও কৈরীর জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলে প্রয়াত নেতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার মাধ্যমে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হবে।
ধন্যবাদান্তে
চা শ্রমিক সংঘ
মৌলভীবাজার জেলা কমিটি
কোর্টরোড (মনুসেতু সংলগ্ন), মৌলভীবাজার। তারিখঃ ১৮ এপ্রিল ২০২৬
